সফটওয়্যার সাপোর্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ক্যারিয়ার – পর্ব ২

প্রথম পর্বেই মোটামুটি বেসিক বিষয় আলোচনা করা হয়ে গিয়েছে। গত পোস্টের প্রেক্ষিতে কিছু প্রশ্ন পাওয়া গিয়েছে। এখানে সেগুলোর উত্তর দেওয়া হবে।

সফটওয়্যার সাপোর্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ক্যারিয়ার – পর্ব ১

কোথায় এবং কি ধরনের কোম্পানিতে সাপোর্টে কাজ করার সুযোগ আছে? বিশেষ করে ওয়েব/ওয়ার্ডপ্রেস ফিল্ডে?

সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে পৃথিবীর প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠানে কাস্টমার সাপোর্ট এক্সিকিউটিভদের প্রয়োজন আছে। হোক তা সুপারশপ, হোক সফটওয়ার কোম্পানি, টেলিকম, ইন্টারনেট সার্ভিস, ব্যাংক – প্রত্যেকের ই নির্দিষ্ট এক বা একাধিক সাপোর্ট চ্যানেল থাকে।

ওয়ার্ডপ্রেস কেন্দ্রিক কাজ গুলো বেশি পাওয়া যায় প্লাগিন ভিত্তিক কম্পানি গুলোতে। থিম ভিত্তিক কোম্পানি গুলোতেও দরকার হয়। তবে তা তুলনামুলক কম জটিল এবং যথাযথ ডকুমেন্টেশন এর মাধ্যমে সাপোর্ট রিকোয়েস্ট অনেকাংশে কমিয়ে ফেলা যায়।

অন্যদিকে প্লাগিন ভিত্তিক কোম্পানিতে ইউনিক রিকোয়েস্ট এর পরিমান বেশি হয়। কারন এক প্লাগিন এর সাথে আরেক প্লাগিন এর integration, compatibility, conflict ইত্যাদি টেস্ট করে সলিউশন দিতে হয়। এগুলোও ডকুমেন্টেশন এর মাধ্যমে অনেক খানি কমিয়ে ফেলা যায়। তবে সব সমস্যা আগে থেকে জানা সম্ভব নয়। তাই অন্তত ৩ টা রিপ্লাই এর প্রয়োজন হয়-ই।

সার্ভিস বেজড কোম্পানিগুলোর আকারও এখন ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে। সে ক্ষেত্রে এটা ওয়ার্ডপ্রেস অপটিমাইজড হোস্টিং ও হতে পারে বা Software as A Service (SASS) ও হতে পারে।

কোথায় এবং কিভাবে সাপোর্ট বিভাগে কাজ খুজতে হয়?

দেশে বেশিরভাগ কাজ পাবেন ফেসবুকে। কারণ ইকমার্স ব্যাবসায়ি থেকে শুরু করে সফটওয়্যার কোম্পানি, কল সেন্টার, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রভাইডার সবারই ফেসবুক পেজ এবং মালিকদের প্রোফাইল আছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন গ্রুপেও তারা পোস্ট দিয়ে থাকেন। একটু কষ্ট করে সার্চ করলেই আপনার কাঙ্খিত টপিক সংস্লিস্ট অন্তত ৩ টি গ্রুপ পেয়ে যাবেন।

একান্তই না পেলে কমেন্টে জানাবেন। যথাসাধ্য চেস্টা করবো।

বিদেশী কোম্পানিতে রিমোট কাজ কিভাবে খোঁজ করা যায়?

বিদেশি কোম্পানি গুলো বেশিরভাগ সময়ে তাদের টুইটার একাউন্টে এবং লিঙ্কড ইন এ পোস্ট দিয়ে থাকে। দেশি বড় কোম্পানি যেমন- গ্রামীণ ফোন, ইউনিলিভার, পার্টেক্স, প্রান আরএফএল ইত্যাদিও লিঙ্কড ইন থেকে রিক্রুট করে থাকে।

তবে এসব চ্যানেল এ সব সময় নজর রাখা সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে সোশ্যাল চ্যানেল গুলো লিঙ্ক জোগাড় করার জন্য ব্যবহার করতে পারেন।

রিমোট কোম্পানিতে কাজ পেতে হলে বিশেষ কোন স্কিলের প্রয়োজন আছে কিনা?

অবশ্যই! একটা অফিসে বসে সরাসরি টিমের সাথে কাজ করা আর রিমোটলি কাজ করার মধ্যে মোটামুটি আকাশ পাতাল তফাৎ।

অনসাইট জব গুলোতে সামনা সামনি বসে কথা বলা যায়, নিজের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়ে অনেক কিছু প্রকাশ করা যায়, কিছু বুঝানোর প্রয়োজন হলে কলিগ কে ডেকে স্ক্রিনে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে আলোচনা করা যায়।

কিন্তু রিমোট জবে বেশিরভাগ যোগাযোগ হয় মেসেজের মাধ্যমে। Skype, Slack, Hipchat ইত্যাদি এখন রিমোট কোম্পানিগুলোর মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। অনেকে আবার সেই ওল্ড স্কুল মেইল পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকেন। আর একটু এডভান্সড কমিউনিকেশন এবং শেয়ারিং এর জন্য Basecamp, Trello, Toggl, Asana ইত্যাদি ব্যবহার করেন।

অতএব রিমোট কোম্পানির ক্ষেত্রে যোগাযোগ থেকে শুরু করে, নোট, প্রজেক্ট, টাস্ক, টাইম ইত্যাদি সহ নানান আনুসাঙ্গিক বিষয়ের সবই হবে অনলাইন টুলস এর মাধ্যমে।

স্ক্রিন শেয়ারিং বা রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট এর ব্যাপার থাকলে Team Viewer, Skype Screen Share বা SSH, Remote Desktop connection ব্যবহারের প্রয়োজন পড়তে পারে।

এগুলো রিমোট কোম্পানিগুলোর কালচারের গুরুত্তপুর্ণ অংশ। অতএব কোন কোম্পানি কি কি পণ্য বিক্রি করে, কি কি সেবা দেয় এবং সেবার জন্য ঠিক কোন কোন টুল ব্যবহার করে এই বিষয়ে আগে থেকে ধারনা না থাকলে শুরুর দিন গুলো অনেক বিরক্তিকর মনে হবে।

আমার ব্যাক্তিগত পরামর্শ হচ্ছে- রিমোট জবে জয়েন করতে চাইলে তার আগে অন্তত ১ মাস working from home, remote job culture, remote job tips এইসব লিখে সার্চ করে পড়াশোনা করা উচিত এবং বিবেচনা করা উচিত যে আসলেই আমি এই ধরনের কাজের জন্য উপযুক্ত কি না।

কিভাবে কাজের জন্য আবেদন করবো?

সাধারণত জব এর এনাউন্সমেন্ট এর সময় ই এপ্লাই করার লিঙ্ক দিয়ে দেয়। এটা বেশিরভাগ হয় কোন ফর্ম বা মেইল এড্রেস। তবে আপনি যদি অভিজ্ঞতা সম্পন্ন হন এবং রিমোটলি কাজ করার ব্যাপারে শিওর থাকেন, তাহলে নিজে থেকেই সরাসরি মেইল করতে পারেন।

মেইলের বডিটাকে ব্যবহার করতে পারেন কভার লেটার হিসেবে। লিখতে পারেন যে আপনি কিভাবে তাদের কোম্পানি সম্পর্কে জানলেন, তাদের কোন কোন প্রডাক্ট আপনার ভালো লাগে, প্রডাক্টের কোন ফিচার বেশি পছন্দ, আপনার মতে সেই প্রডাক্টগুলোকে আরও কিভাবে উন্নত করা যায় এবং অবশ্যই ওই কোম্পানিটিকে আপনি ঠিক কিভাবে সাহায্য করতে পারবেন।

আবেদনে কি কি বিষয় মেনশন করা উচিত?

কভার লেটার বা এই ধরনের কিছু লেখার যায়গা থাকলে সেটা অবশ্যই সদ্ব্যবহার করতে হবে। মেইলে আবেদন করতে বললে মেইলের বডিই হবে কভার লেটার লেখার যায়গা। আর যদি আলাদা করে কভার লেটার দিতে বলে, তাহলে তো আলাদা করে একটা পিডিএফ ফাইল এটাচ করতে হবেই।

তবে ইনফরমেশনের রিপিটেশন হায়ারিং ম্যানেজারের মনে বিরক্তির উদ্রেক করতে পারে। তাই চেষ্টা করবেন মেইলের বডি এবং কভার লেটারের পিডিএফ ফাইল এর লেখা যেন সেইম না হয়ে যায়।

মনে রাখতে হবে যে, কোম্পানিগুলোর রিমোট কালচারে আসার পেছনের একটা মূল কারণ হচ্ছে দুনিয়ার যেকোনো যায়গা থেকে বেস্ট প্রাইসে বেস্ট রিসোর্স হায়ার করা। অতএব আপনার এপ্লিকেশন এর ক্ষেত্রে যত যত্নবান হবেন, এটা ততটা আপনার সিরিয়াসনেস দেখাবে এবং রিপ্লাই পাওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি করবে।

রিমোট কোম্পানি গুলো কমিউনিকেশন এর প্রতি সর্বোচ্চ জোর দেয়। অতএব তারা অবশ্যই আপনার মেইল পড়বে। এটা নিয়ে কোন কনফিউশনের কারণ নেই। মেইল ভালো লাগলে এটাচ করা ফাইলও চেক করবে।

আমার ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে সিভি বা রিজিউম জবের ক্ষেত্রে খুবই নগণ্য একটা অংশ। আপনার পড়াশোনা খুব বেশি ভালো না হলে সেই অংশগুলো স্কিপ করে যাওয়া যায়। ট্রেনিং এবং এক্সপেরিয়েন্স না থাকলে আইটি কোম্পানির ক্ষেত্রে সেটাও কোন বড় মাথা ব্যাথার কারণ না।

তবে স্কিল আপনার অবশ্যই থাকতে হবে। কাজ না জানলে পয়সা দিয়ে কেউ রাখবে না। অতএব কি কি জানেন, পারেন, করেছেন, তা অবশ্যই সিভি বা রিজিউম এ উল্লেখ থাকতে হবে।

স্কিল স্পষ্ট করার জন্য লিস্ট বা টেবিল হিসেবে সাজাতে পারেন। অর্ডারিং এর জন্য রিলিভেন্স, ক্যাটাগরি ফলো করতে পারেন। অপ্রাসঙ্গিক স্কিল থাকলেও উল্লেখ করা যাবে না।

প্রত্যেক জবের জন্য আলাদা করে রিজিউম তৈরি করতে হবে।

আমি জানি এটা সময় সাপেক্ষ কাজ এবং আলসেমি লাগে। তবে এই কম্পিটিশন এর যুগে এইটুকু কষ্ট করাই লাগবে। এর কোন বিকল্প নেই।

সাপোর্ট ইঞ্জিনিয়ারদের কাজের শিডিউল কেমন থাকে

ইমেইল বেজড সাপোর্ট হলে এবং ছোট সাইজের কোম্পানিগুলোর বেশিরভাগ সময় নির্দিস্ট ওয়ার্ক আওয়ার থাকে না। ফ্লেক্সিবিলিটি থাকে দিনের (এবং রাতের) যেকোনো সময় রিপ্লাই দেওয়ার। তবে ফুল টাইম জব হলে সপ্তাহে মোট ৪০ ঘণ্টা বা নির্দিস্ট পরিমাণ সাপোর্ট টিকেট resolve করার টার্গেট থাকবে।

রিয়েল টাইম কমিউনিকেশন যেমন কাস্টোমারের সাথে pre-sales meeting বা লাইভ চ্যাটে সাপোর্ট দিতে গেলে আবার কাজের স্বার্থেই সময় বেঁধে নিতে হবে।

আবার সপ্তাহে বা দিনে একদিন টিম মিটিং, কাজের আপডেট দেওয়া, বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট এর মধ্যে কনফিউশন থাকলে তা সমাধান করার জন্য একটা নির্দিস্ট সময় ঠিক করে দেওয়া থাকতে পারে। মিটিং এর নিয়ম একেক কোম্পানিতে একেক রকমের হয়।

বাইরের কোম্পানিতে আওয়ারলি রেট/ সেলারি কেমন থাকে?

বিদেশ মানে ডলার আর ডলার মানেই অনেক টাকা 😉

ঘণ্টা হিসেবে কাজ করলে কাস্টোমার সাপোর্টে আমার দেখা মিনিমাম ৭ ডলার আর সর্বোচ্চ ২৫ ডলার

ফুল টাইম কাজ করলে এবং রেপুটেড কোম্পানি হলে “সিক্স ডিজিট” কনফার্মড। তবে এপল প্রোডাক্টস এর লিস্ট করার আগে স্কিল এর ব্যাপার টা ভুলে গেলে চলবে না :p

কাজ পাওয়ার জন্য এবং সাপোর্ট নিঞ্জা হিসেবে কাজ করার সময় টিপস

১। যেকোনো কোম্পানিতে এপ্লাই করার আগে তাদের সম্পর্কে যথেষ্ট পরিমাণ রিসার্চ করতে হবে। জবে এপ্লাই করার আগের পদক্ষেপ হচ্ছে ক্রাশ কে প্রপোজ করার আগে stalk করার মত। যত বেশি জানবেন, তত ভালো প্ল্যান করতে পারবেন এবং ইয়েস বলার চান্স তত বাড়বে।

২। কভার লেটার নিজেকে তুলে ধরার বেস্ট যায়গা। মেইল পাঠানোর সময় রিজিউম পাঠাতে বলেছে বলে শুধু ২-১ লাইন লিখে রিজিউম এটাচ করে পাঠিয়ে দিলে হবে না। মিনিমাম ২০০ শব্দের মধ্যে নিজেকে তুলে ধরতে হবে। পাঠককে কনভিন্স করতে হবে।

৩। ইন্টারভিউ ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং এপ দিয়ে হতে পারে। কমন টুলস গুলো সম্বন্ধে ধারনা না থাকলে অবশ্যই মেইল পাঠানোর পর পরই সেগুলো দেখা শুরু করুন। নতুবা ইন্টারভিউ এর সময় লজ্জায় পড়তে হবে।

৪। কখনো ভুল ইনফরমেশন দেওয়া যাবে না। বাড়িয়ে বলা যাবে না। যতটুকু কনফিডেন্স এর সাথে পারবেন, ঠিক ততটুকুই বলবেন। হুদাই ভাব নিলে ধরা খাওয়ার চান্স ১০০%।

৫। কাস্টমারের সাথে কখনো মিথ্যা বলা যাবে না। ইনফ্যাক্ট কারো সাথেই মিথ্যা বলা যাবে না। সব সময় সবার সাথে true থাকতে হবে। প্রডাক্টে সমস্যা থাকতেই পারে। কাস্টোমারকে মিথ্যা আসা দিয়ে বা দোষ দিয়ে সময় ক্ষেপণ করা যাবে না। দোষ থাকলে অবশ্যই স্বীকার করে বাস্তব একটা সময় চেয়ে নিয়ে তা সমাধান করতে হবে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.